ঘুরে আসুন মৈনটঘাট থেকে

0
260

ইকরামুল হাসান শাকিল:

“জাহাজ যেমন ডাকে সেইভাবে ডাক দিও তুমি
তোমার ছাড়ার আগে একবার হর্নখানি দিও
সকল বন্ধন ছিঁড়ে তোমার বন্ধন তুলে নেবো,
একটি সামান্য ব্যাগ কিংবা তাও ফেলে দিতে পারি”।

কবি মহাদেব সাহা হয়তো তার প্রিয়ার ডাকে সামান্য ব্যাগটা ফেলে দিতে পারেন। তবে সেই সামান্য ব্যাগটাই কাঁধে তুলে নিয়েই ঘর ছাড়ার পাগলও কম নেই। তেমনি সেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘর ছেড়ে প্রকৃতির প্রেমে সুযোগ পেলেই আমরা বেরিয়ে পরি কাছে কিংবা দূরে। হারিয়ে যাই নিজেদের মতো করে।
ঘুরে এলাম জীবনানন্দ দাসের রূপসী বাংলার রূপ আর স্যর জগদীশ বসুর বাড়ি দেখে। ১৪ জনের একটি দল দু’টি নোয়াহ্ গাড়ি নিয়ে যাই। প্রথমে গড়ি দু’টি আমাদের সুবিধা মতো জায়গা থেকে তুলে নিয়ে আল রাজ্জাক হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে সবাই একত্র হয়ে সকালের নাস্তা করি। দলনেতা মুহিত ভাই (এভারেস্ট জয়ী) আমাদের আগেই হোটেলে এসে পৌছান। খাবার শেষে সকাল ৮টার দিকে আমরা আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।


ঢাকা মাওয়া হাইওয়ে। গাড়ি চলছে। যদিও গান ধরেছি “গাড়ি চলে না চলে নারে…’’। পথে চা পানের বিরতি। কে কোন চা খাবে, কার চিনি কম বা বেশি, এসব নিয়ে বেশ কিছু সময় কেটে গেলো। চা খেয়ে আবার গাড়ি তে শুরু করেছে। চলছি সমতল রাস্তায়, গান শুনছি অঞ্জন দত্তের “দার্জিলিং এর রাস্তায়”। সাড়ে ন’টার মধ্যেই আমরা শ্রীনগর রাঢ়ীখাল স্যর জগদীশ বসুর বাড়ি চলে এলাম। জগদীশ বসুকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। এখানে একটি জাদুঘর রয়েছে। যেখানে বেশ কিছু বসুর নথিপত্র সংরক্ষণ করা আছে। কমপ্লেক্সের পাশেই ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই “স্যর জগদীশ চন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন ও কলেজ”। ঘন্টাখানেক এখানে থাকার পর আমরা ভাগ্যকুল বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ঢাকার কাছেই এত্তো সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশ ভালো কার না ভালো লাগে। আকাবাকা পথ আর সবুজের সমারোহ। রোদ আর কুয়াশার মিশেল দিনটাই যেনো ঘুরে বেড়ানোর।
আধ ঘন্টার মধ্যেই আমরা পৌছে গেলাম ভাগ্যকুল বাজারে। এই বাজারে আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম ক্ষেত থেকে তুলে আনা টাটকা সবজি আর নদী থেকে তুলে আনা তাজা তাজা মাছ। এখানে কমদামে টাকটা সবজি পেয়ে আমাদের অনেকেই লাউ, আালু, শাক ইত্যাদি কিনে নিলো। রুপক ভাই তো প্রায় আমার সাইজের একটা লাউ কিনেন। এই এক লাউ দিয়েই কি তিনি পুরো শীতটাই পার করে দেয় কিনা কে জানে? কেনাকাটা শেষে আমরা গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভান্ডারে মুন্সিগঞ্জের বিখ্যাত মাঠা খাই। মাঠা অবশ্য শামীম ভাই বেশি খেয়েছে। আমিও খেয়েছি ২গ্লাস খেয়েছি।


সাড়ে বারোটার দিকে আমরা দোহার মৈনটঘাট পৌছাই। বিশাল পদ্মার পাড়ে চিকচিক বালুময় ঘাট থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে চলছি দূর বালুচরে। দু’চোখ যতদূর যায় শুধু পানি আর পানি। আকাশ আর পানি এক জায়গায় মিলিত হয়েছে দেখা যাচ্ছে। শীতল বাতাস আর পানির ঢেউ দেখতে দেখতে একসময় বালুময় পদ্মার এক ছোট চরে এলাম। এর আগে কখনো আমি চরে আসিনি। তাই আমার আনন্দটাও অনেক বেশি। এখানে আমাদের দৌড় প্রতিযোগিতা দেন মুহিত ভাই। ছেলেদের মধ্যে আমি ও মেয়েদের মধ্যে রত্নাপু প্রথম হই। কত রঙে ঢঙে আমরা ছবি তুলি তার হিসাব নেই। কেউ বসে, কেউ বালু উড়িয়ে আবার কেউ লাফিয়ে শুন্যে ভেসে।
মৈনটঘাট থেকে আমরা চলে আসি বান্দুরা বাজারে। এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে এখানকার বড় গির্জা দেখতে যাই। হাসনাবাদের পবিত্র জপমালা রানীর গির্জা। এটি ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানেই মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত একাত্তরের যিশু সিনেমাটি শুটিং হয়েচিলো। যেহেতু আজ বড়দিন সেহেতু গির্জায় উৎসব চলছে।
দিনের ক্লান্ত বিকেলে যখন সূর্যটা পশ্চিম আকাশে তখন আমরা আবার ঢাকার পথে। এবারা বাড়ি ফেরার পালা। আরো একটি আনন্দঘন দিনের সমাপ্তি হলো। আবারো নতুন কোন গন্তব্যের অপেক্ষায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here