লিভার ও ক্যান্সার প্রতিষেধক সহ ‘বিট’র ১৮ এর অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য উপকারীতা

0
581

প্রবন্ধ:- আকাশ আমিন

বিট একটি সবজি জাতীয় ফল।এটি অন্যান্য সবজির মতো রান্না করেই খেতে হয় না। বিট রুট কাচা খাওয়া যায়। সবচেয়ে প্রচলিত বিট এর জুস, এই জুস খেতে হাল্কা মিষ্টি মিষ্টি লাগে এতে কোনো চিনির প্রয়োজন হয় না। দেখতে কালার হয় রক্তের মতো লাল।

প্রাচীন সময় থেকেই বিটের বিশেষ কদর রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা বিভিন্ন রোগের হাত থেকে মুক্তি পেতে নিয়ম করে বিট খেতেন। এর নানাবিধ কারণ রয়েছে। ভিটামিন, জিঙ্ক, আয়োডিন, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্লোরিন, সোডিয়াম-সহ নানা পরিপোষক পদার্থে ভরপুর হল বিট। ডায়াবেটিস, অ্যানিমিয়া, উচ্চরক্তচাপ, থাইরয়েডের মতো নানা অসুখ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকরী সবজি হল বিট। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলতে গেলে মাত্র একটি। তা হল বিট খেলে প্রসাবের রং লাল হয়। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

বিটরুট রক্ত ও হৃদয় সুস্থ রাখে। এর নাইট্রেইট উপাদান নাইট্রিক অ্যাসিড সরবারহ করে। এটা লোহিত কোষ সমৃদ্ধ করে, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ায় এবং শরীরে অক্সিজেনের সরবারহ বাড়িয়ে কর্মশক্তি বাড়ায় ও হৃদরোগ দূরে রাখে। এছাড়াও বিট খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। বিট উচ্চ আঁশ সমৃদ্ধ, যা পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখে এবং সংবেদনশীল পেটের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটা কিডনির স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়া কমাতে সাহায্য করে। এর ফোলেট ও বেটালেইন নামক উপাদান হজমক্রিয়া ভালো রাখে ও প্রজননস্বাস্থ্য বৃদ্ধি করে।

১) অ্যান্টি অক্সিডেন্ট দূর করেঃ বিটরুট শরীরকে ফ্রি রেডিক্যাল এর ক্ষতিকারক হাত থেকে বাঁচায়। শরীরে ফ্রি রেডিক্যাল বিভিন্ন কারণে তৈরি হতে পারে যেমন লাইফস্টাইল‚ স্ট্রেস। এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষতিকারক কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হয়। নিয়মিত ধূম পানের থেকেও এটা হতে পারে। এর ফলে ক্যান্সার‚ আর্থারাইটিস এবং অ্যালঝাইমারস ডিজিজ হতে পারে। বিটে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকায় ফ্রি রেডিক্যাল এর ক্ষতিকারক দিক থেকে শরীরকে বাঁচায়। ফলে এই সবজি নিয়মিত খেলে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যায়।

২) উচ্চ রক্তচাপ কমায়ঃ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে বিটের জুড়ি নেই। বিভিন্ন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যারা বিটের জুস পান করে তিনঘন্টার মধ্যে রক্তচাপ কমে গেছে তাদের। এটা হয় কারণ বিটের মধ্যে নাইট্রেট আছে যা শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডে পরিবর্তন হয় যা রক্তচাপ কমায়।

৩) ক্যান্সার সেল নষ্ট করেঃ রাশিয়ার এক রিসার্চ থেকে জানা গেছে, বিটরুট লাং এবং ত্বকের টিউমার রোধ করে। এছাড়াও দেখা গেছে প্রস্টেট আর ব্রেস্ট ক্যান্সারের সেল নষ্ট করতে পারে বিটরুট। মনে করা হয় বিটে অবস্থিত বেটানিন এমনটা করতে সাহায্য করে।

৪) কর্মক্ষমতা বাড়ায়ঃ শরীরকে সুন্দর এবং ফিট রাখার জন্য রোজ জিম করেন। এখন থেকে তার সঙ্গে খান বিট। এটি পেশীর শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও খুব তাড়াতাড়ি এনার্জি আনতে খেতে পারেন বিটের রস। জিমের পর খুব ক্লান্ত লাগলে খেয়ে নিন একগ্লাস বিটের রস। মুহূর্তে এনার্জি আসবে।

৫) বুদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করেঃ বিট খাওয়ার ফলে ব্রেনে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। যারা নিয়মিত বিট খেয়েছে তাদের চিন্তা ভাবনা করার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় অনেকটাই বেশি।

৬) লিভার সুরক্ষিত রাখেঃ বিট হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে সাহায্য করে। বদহজম ছাড়াও, এটি পেটের অন্যান্য রোগ যেমন জন্ডিস, ডায়রিয়া, প্রভৃতি রোগের ক্ষেত্রে খুব উপকারি। এটি ফ্যাটি লিভারের সমস্যাও নিয়ন্ত্রণ করে। লিভারের ফাংশানকে ভালো রাখে।

৭) ঋতুচক্রের সমস্যা দূর করে: সময়ের আগেই মেনোপজের লক্ষণ দেখা দিলে বা ঋতুচক্র সংক্রান্ত কোনও সমস্যা হলে বিটের জুস খান। বিটে থাকা আয়রণ নতুন লোহিত রক্তকণিকা গঠনে সাহায্য করে। যার ফলে ঋতুচক্রের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৮) ক্যানসারের চিকিত্‍‌সায়: বিটের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-টিউমার গুণ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত কোষের হাত থেকে সুস্থ কোষগুলোকে বাঁচায়। নতুন কোষ গঠনে সাহায্য করে।

৯) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে: বিট হল হাই অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। ফলে শরীর থেকে টক্সিন বের করতেও কাজে দেয়।

১০) কোষ্ঠকাঠিন্যেও বিট: যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে, উচিত বেশি করে বিটের জুস খাওয়া। বিপাকের সমস্যা দূর করে হজমশক্তি বাড়ায়। পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দূর হয়।

১১) রক্তাল্পতা ও আয়রন ঘাটতিতে: বিটে প্রচুর আয়রন থাকে, যা লোহিত রক্তকণিকার জন্য অত্যন্ত জরুরি উপাদান। যে কারণে রক্তাসল্পতায় যাঁরা ভুগছেন, বা যাঁদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, বেশি করে বিট খাওয়া উচিত।

১২) পেশিশক্তি বাড়ায়: মাসল ফোলাতে রোজ জিমে যাচ্ছেন? তা ভালো, সঙ্গে নিয়ম করে বিটের জুস খান। তার কারণ বিট পেশিশক্তি বাড়ায়।

১৩) ত্বকে জেল্লা আনে: বিটের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-এজিং ফর্মুলা। ফলে, ত্বক থেকে বার্ধক্যের ছাপ দূর করতে নিয়মিত বিট জুস খান।সাথে ত্বকের অন্যান্য সমস্যাও দূর করে। ত্বকের সৌন্দর্য ও বৃদ্ধি করে।

১৪) ডিপ্রেশন দূর করতে জুড়ি নেই: কোনও কারণে ডিপ্রেশনে ভুগছেন? বিষণ্ণতা আপনাকে গ্রাস করছে? বিট জুসই হতে পারে সেরা প্রাকৃতিক ওষুধ। বিটে ট্রিপ্টোফান ও বিটেইন নামে যে উপাদান থাকে, তা ডিপ্রেশন কাটাতে ভালো কাজ দেয়।

১৫) জন্মগত ত্রুটি দূর করে: বিট রুটের মধ্যে রয়েছে ফোলেট ও ফলিক অ্যাসিড। যার কাজ হল জন্মগত ত্রুটি দূর করা। যে কারণে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদেরও বিট জুস খাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা।

১৬) বিট অস্টিওপোরোসিস দূর করে এবং হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখে (এর নাইট্রিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়ামের জন্য)। এছাড়াও আছে ক্যারোটেনয়েডস ও লুটেইন যা অ্যান্টি-এইজিং হিসেবে কাজ করে।

(১৭) ক্যান্সার সেল নষ্ট করে: রিসার্চ বলছে বিট রুট লাং এবং ত্বকের টিউমার রোধ করে। এছাড়াও দেখা গেছে প্রস্টেট আর ব্রেস্ট ক্যান্সারের সেল নষ্ট করতে পারে বিটরুট। মনে করা হয় বিটে অবস্থিত বেটানিন এমনটা করতে সাহায্য করে।

(১৮) উচ্চমাত্রায় নাইট্রেটসমৃদ্ধ বিটরুটের জুস খেলোয়াড়দের পারফর্মেন্স বাড়াতে দারুণ কার্যকর বলে জানা গেছে এক গবেষণায়। এ বিটরুট খেলোয়াড়ের পারফর্মেন্স বাড়ানোর পাশাপাশি টিমওয়ার্কের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ায়। বিটরুট জুস পান করে রাগবি ও ফুটবলের মতো খেলায় খেলোয়াড়দের এসব বিষয়ে উন্নতি দেখা গেছে।

এ বিষয়ে গবেষকদের প্রধান এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের গবেষক ক্রিস থমসন বলেন, ‘এ গবেষণা নাইট্রেট সাপ্লিমেন্টেশনের বিষয়ে একটি সত্যিকার মাইলফলক।’

ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের গবেষক ও প্রফেসর অ্যান্ড্র জোনস বলেন, ‘নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, বিট জুস শারীরিক ও মানসিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়।’ এর আগে এক গবেষণায় জানা গিয়েছিল, বিটরুটের জুস পান করা হলে তা শারীরিক অনুশীলনের ক্ষমতা ১৬ শতাংশ বাড়ায়। সর্বশেষ গবেষণায় ১৬ জন পুরুষ খেলোয়াড়কে বাছাই করা হয়। তারা টিমওয়ার্কের মাধ্যমে খেলেন। তাদের প্রত্যেককে ১৪০ মিলি লিটার করে হাই নাইট্রেট বিটরুট জুস পান করতে দেওয়া হয় পরপর সাত দিন। এরপর আবার তাদের বিটরুট ব্যতীত অন্য পানীয় পান করতে দেওয়া হয়। এভাবে উভয় পানীয়ের ফলে খেলোয়াড়দের পারফর্মেন্স কতখানি পরিবর্তিত হয়, তা লিপিবদ্ধ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, নাইট্রেট বিটরুট পান করার পর খেলোয়াড়দের স্প্রিন্ট পারফর্মেন্স বাড়ে ৩.৫ শতাংশ। অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে তিন শতাংশ।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড সাইকোলজিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here