‘দেওয়ান বাড়ি’ ঐতিহ্যবাহী এক সুরের পরিবার

0
1014

মাহবুব মিনেল:- ঢাকা সদর থেকে কয়েক কি.মি. দূরে কেরানিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দেওয়ান বাড়ি এর নাম কম বেশি সবারই জানা। অনেকে এই বাড়িকে বাউল সম্রাট ও সাধক মালেক দেওয়ান ও খালেক দেওয়ানের বাড়ি হিসেবেই জানেন। এই পরিবারেরই সন্তান আজাদ দেওয়ান (মুক্তি)। যিনি একাধারে নিজের বংশীয় ধারার পাশাপাশি কাওয়ালি, গজল, নজরুল সংগীতসহ, সুরের সকল অঙ্গনে প্রমাণ করেছেন নিজের যোগ্যতা, সেই সঙ্গে লিখেছেন, সুর করেছেন ও গেয়ে চলেছেন অনেক গান। আজাদ দেওয়ানের পরদাদা অর্থাৎ দাদার বাবা সূফী সাধক হজরত আলেফ চান শাহ ওরফে আলফু দেওয়ান (১২৪৬-১৩৩৬)। থেকেই এই পরিবারের গল্পের শুরু। আলফু দেওয়ানই তার বংশে প্রথম শুরু করেছিলেন বাউল গান লিখা সুর করা ও সূফী সাধনা। তার রচনা ও সুর করা অনেক গান আছে উল্লেখ করার মতো যেগুলো দেওয়ান শিল্পীদের পরিবেশনায় আমরা শুনে আসছি। তার গানগুলোর মধ্যে দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব এবং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির যে প্রেমের সম্পর্ক তা তুলে ধরেছেন। তৎকালীন সময়ে তিনি দেশে ও উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে গান পরিবেশন করে বেরিয়েছেন। আলফু দেওয়ানের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে গীতিকার, সুরকার, এবং বাউল শিল্পী ও সাধক-আব্দুল মালেক দেওয়ান (১২৯৯-১৩৯৫)। এবং ছোট ছেলে-আব্দুল খালেক দেওয়ান। আব্দুল মালেক দেওয়ানও একাধারে সারাদেশে ও এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধ্যাত্মিক গানের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছেন পালাগানের মাধ্যমে। আর তার ছোট ভাই খালেক দেওয়ানও ঠিক একই সময়ে একইভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন এই বংশীয় ধারাতে। মালেক দেওয়ান এর দুই ছেলে মো. খবিরুদ্দিন দেওয়ান ও মো. সাবিরুদ্দিন দেওয়ান। তারা দুই ভাই ও একই সঙ্গে বংশীয় ধারাতেই নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সাবিরুদ্দিন দেওয়ান এই ধারাতে কিছুটা পিছপা হন। আর খবিরুদ্দিন দেওয়ান নিজেকে গানের সঙ্গেই নিয়োজিত রেখেছিলেন।

ছবিতে দেওয়ান বাড়ির পূর্ব পুরুষেরা এবং আজাদ দেওয়ান ‍মুক্তি

তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম শ্রেণীর গীতিকার, সুরকার, ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার লেখা ও সুর করা গানগুলো এখন তার ছেলেরা, বিশেষ করে জনপ্রিয় পালাগান শিল্পী আরিফ দেওয়ান ও আরেক ছেলে আজাদ দেওয়ান মুক্তিসহ তাদের বংশধরেরা নিয়মিত চর্চা ও সুর না করা গানগুলো, সুর দিয়ে ভক্ত ও স্রোতাদের মাঝে নিয়ে আসছেন। খবিরুদ্দিন দেওয়ান (১৩৩৬- ১৪১৩)-এর ৭ ছেলে আর ৪ মেয়ে, যারা প্রত্যেকেই বংশের ধারা অনুযায়ী কম বেশি গানের সঙ্গেই যুক্ত আছেন। এর মধ্যে তার ৪র্থ ছেলে হলেন- আজাদ দেওয়ান (মুক্তি) যিনি মাত্র ৭ বছর বয়সে গান শুরু করেন। ৮০-এর দশকে নতুন কুড়ি প্রতিযোগিতায় লোকজ গানে বাংলাদেশের ২য় স্থান অর্জন করেন।

পরবর্তীতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নজরুল সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরকম ছোট বড় মিলিয়ে আরো অনেক প্রতিযোগিতায় তার অর্জন ছিল গানপাগল শুভাকাক্সক্ষীদের খুশী করার মতো। আজাদ দেওয়ান (মুক্তি) তার শিকড়কে ধরে রেখেছেন এবং বিভিন্ন ধারার সংগীতকে আয়ত্ত করে তখন থেকেই পরিবেশন করে আসছেন। তার সংগীতের অনুপ্রেরণা মুলত তার পূর্ব পুরুষগণ। বিশেষ করে তার বাবা খবির দেওয়ান, যিনি উৎসাহ প্রদান ও হাতে খড়ি দিয়ে তাকে হারমোনিয়াম বাজানো ও গান শিখিয়েছিলেন।

আজাদ দেওয়ান একাধারে নজরুল, আধুনিক, এবং উপমহাদেশের গজল ও কাওয়ালি সংগীত এর চর্চা ও পরিবেশন করে থাকেন।

তিনি বাফা থেকে নজরুল সংগীত এর সার্টিফিকেট কোর্সসম্পন্ন করে পরবর্তীতে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে শুদ্ধসুর ও বাণীতেও কোর্সসম্পন্ন করেছেন, নিজের জানার আগ্রহ ও আত্মতৃপ্তির জন্য। বাজারে তার বেশকিছু কাওয়ালি, ফোঁক ও আধুনিক গানের অ্যালবাম রয়েছে। এর মধ্যে চাই তোমার দিদার, মন জানে, ও প্রাচীর অন্যতম। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্তর্ভুক্ত একজন নিয়মিত শিল্পী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here