শাড়িতে নারী, নারীর জন্য শাড়ি

0
1178

আনন্দ বিনোদন  ডেস্ক: বাঙালি নারীর সব সময়েরই প্রিয় পরিধেয় শাড়ি। সময়ের পরিবর্তনে পরিধেয়টি প্রধান থেকে অন্যতমে জায়গা পেয়েছে। বাঙালির শাড়ি পরার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। এমনকি পৃথিবীর যে কয়টি জাতিগোষ্ঠী হাজার বছর ধরে তাদের প্রাচীন পোশাক এবং এর ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে, বাঙালি এবং তার শাড়ি সেগুলোর মধ্যে একটি।  উপমহাদেশের ভারতীয় উপত্যকায় শাড়ি পরিহিত প্রথম প্রকাশিত ছবিটি হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দের। এই ছবিটিতে একটি মূর্তির মাধ্যমে একজন ধর্মযাজিকাকে প্রস্ফুটিত করে তোলা হয়েছিল যার সর্বাঙ্গ শাড়িতে জড়িত ছিল। উত্তর ভারতেও টেরাকোটার মাধ্যমে চিত্রিত করা একটি প্রাচীন নারী মূর্তি দেখা গেছে যেটির সর্বাঙ্গ ধুতির মতো করে জড়ানো শাড়ি দ্বারা আবৃত।যুগ যুগ ধরে সেলাইবিহীন প্রাচীনতম এই পোশাকটি এর আবেদনময়ী ও মোহনীয় রূপটি শুধু ধরেই রাখেনি অনেক তাঁতশিল্পী, মুদ্রণশিল্পী ও চিত্রশিল্পী-ই সৃজনশীল সৃষ্টির অণুপ্রেরণা হয়ে আছে।

কালের আবর্তে শাড়ি পরার ধরনের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই কিন্তু এর আবেদন এখনও এতটুকু ম্লান হয়নি। বিমানবালাদের শাড়ি পরার মাধ্যমে ইদানীংকালে বহির্বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা অনেকটুকু ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর সৌন্দর্য অনেককেই বিমোহিত করে তুলছে। তাই হয়তো ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন যখন বিশ্ববিখ্যাত আর এক তারকা অপরা উইনফ্রের ‘শো’তে গিয়েছিলেন তখন অপরা উইনফ্রেকেও শাড়ি পরিহিতা দেখা গেছে। এমনকি অ্যাঞ্জেলিনা জোনস্, এলিজাবেথ হারলির মতো বিশ্বখ্যাত তারকারাও শাড়ি পরিহিত অবস্থায় জনসম্মুখে দেখা দিয়েছেন।যুগ যুগ ধরে দেখা গেছে নারীরাই কোনো জাতি বা এলাকার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অধিক আগ্রহী থেকেছে। আমাদের মা-খালারা শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরিধান করাটাকে লজ্জাজনক বলে মনে করতেন। শাড়ি পরেই তারা সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করতেন। আমাদের সময়ও একই ধারা চলে এসেছিল এবং বিবাহিত কোনো মহিলাকে শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরতে দেখা যেত না।শাড়ি এমন একটি পোশাক যা একজন নারীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত আবৃত করে রেখেও তার নারীত্বকে আরও নমনীয় ও বিনয়ী রূপে প্রস্ফুটিত করে তোলে।

ঈদের মৌসুমে হরেক রকমের শাড়ি বাজারে পাওয়া যায়। তবে বর্তমান সময়ে শাড়িতে মসলিনের কদর বেড়েছে। রাতের শাড়িতে মসলিন প্রাধান্য পায়। শাড়িতে এমব্রয়ডারি, পাড়ে বসানো বড় প্লিট, কখনো আর্টিফিশিয়াল ফেদার, কাটওয়ার্ক, পুঁতি ও জরির কাজ, অ্যাপ্লিকে এসব দেখা যায়। সিল্কের শাড়িতে হাতের কাজ বেশি দেখা যায়। তার মধ্যে মেশিন ও হাতের এমব্রয়ডারিই বেশি থাকে। আবার কনট্রাস্ট ফ্যাব্রিকের শাড়িও রয়েছে ট্রেন্ডে। রয়েছে অর্ধেক সিল্ক এবং অর্ধেক মসলিন শাড়ি। জর্জেটের শাড়িতে ফ্লোরাল প্রিন্ট, তার মধ্যে হালকা অ্যাম্বেলিশমেন্ট দেখা মিলে। আবহাওয়ায় গ্রীষ্মের প্রভাব বেশি থাকলেও রাতের পার্টিতে শাড়ির সঙ্গে পরে নিতে দেখা যায় জ্যাকেট। তবে সেটি হয়ে থাকে হালকা ওজনের কাপড়ে তৈরি। আর যাঁরা জ্যাকেট এড়িয়ে চলতে চায়, তাঁরা ট্রেন্ডি লুকের জন্য বেল্ট ব্যবহার করে। সেটা হতে পারে লেসের, মেটাল বা কাপড়ের। সঙ্গে যোগ করতে দেখা যায় বিভিন্ন রকমের বাকলস।স্বস্তির কথা মাথায় রেখে সুতি, খাদি, লিনেন, এন্ডি সুতির প্রাধান্য বেশি দেখা যায়। তার পাশাপাশি সিল্ক, এন্ডি সিল্ক, মসলিন, শিফন, জর্জেটের প্রাধান্য থাকে। কাপড়ের বুননে দেখা যায় ভিন্নতা। মসৃণ কাপড়ের পাশাপাশি বিভিন্ন রকম জেকার্ড কাপড়ের দেখা মিলে, সঙ্গে আছে বিভিন্ন রকমের প্রিন্টের বাহার। রঙের ক্ষেত্রে স্নিগ্ধতা যেমন থাকে, তেমনই থাকে বাহারি রঙের ব্যবহার বা কনট্রাস্ট। তবে সাদা, হালকা রঙের শেড, লাল, কমলা, বেগুনি, অ্যাশ, ম্যাজেন্টা, গোলাপি ইত্যাদি রঙের শেডও চোখে পড়ে।এখন শাড়ি পরার ক্ষেত্রেও এসেছে নতুনত্ব। আগের মতো ট্র্যাডিশনালা ব্লাউজ দিয়ে শাড়ি না পরে অনেকেই, বিশেষ করে তরুণীরা ক্রপটড, শার্ট, টপ, টি-শার্টকে শাড়ির চমৎকার সঙ্গী করেছেন। তাতে বেশ একটা ট্রেন্ডি লুক যেমন এসেছে, তেমনি উচ্ছলতাও প্রকাশ পায়। পরার মুনশিয়ানায় খুব সাধারণ শাড়িও অসাধারণ হয়ে ওঠে।

মডেল: শাহীনুর আক্তার

শাড়ি পরার চল কমেছে। তাই নিরীক্ষাধর্মী পরিধানরীতি শাড়ির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। কম বয়সীরা সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, স্কার্ট-টপস, প্যান্টস-শার্ট, টি-শার্টের স্বাচ্ছন্দ্য মেনে নিয়েও শাড়ির প্রতি আগ্রহী হচ্ছে এবং পরছে।বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস, যেমন শাড়ি করেছে বিভিন্ন ডিজাইন এবং থিমে তেমনি ডিজাইনাররা করছেনে বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষাধর্মী শাড়ি। ফলে এবার ঈদে স্পষ্ট শাড়ির বৈচিত্র্য। আর এটা বেশ আশা জাগানো। এমনকি তাঁতের শাড়িতেই দেখা যাচ্ছে নতুন নতুন ডিজাইন। ফলে শাড়ি নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ ঘটছে না।বরং শাড়ি নিয়ে এই উচ্ছ্বাস সত্যিই শাড়ির ভবিষ্যৎকে আরও সুগম করে। নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করে। ঈদে সবাই শাড়ি কিনেও থাকেন নিজে পরার জন্য কিংবা উপহার দেওয়ার জন্য। আর এর মধ্যে দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে ভোক্তারা আন্তরিক পৃষ্ঠপোষণা দিয়ে থাকে শাড়িকে। এভাবে করে টিকে থাকছেন এই শিল্প ও শিল্পীরা।

তবে দুঃখের বিষয় ইদানীং মহিলাদের মধ্যে শাড়ি পরার ব্যাপারে কেমন জানি একটা অনিহা দেখা দিয়েছে এবং সালোয়ার-কামিজ পরাটাকে ফ্যাশনের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এই প্রবণতা এতটাই প্রকট হয়ে উঠছে যে কে মা আর কে মেয়ে তা বোঝা কঠিন হয়ে উঠছে, স্কুল-কলেজে কে ছাত্রী আর কে শিক্ষিকা তা বোঝা সম্ভব না হয়ে ওঠায় অনেক সময় কিছু কিছু লজ্জাজনক অবস্থারও সৃষ্টি হচ্ছে। শাড়ির প্রতি এই অনিহা অব্যাহত থাকলে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যেই শাড়ি হয়তো পরিত্যক্ত একটি পোশাকে পরিণত হবে।

শাড়ি না পরার কারণ হিসেবে অনেকে বলতে চাইছেন এটা কোনো আরামদায়ক পোশাক নয়। তবে আমার দীর্ঘ শাড়ি পরার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই যে এটা সম্পূর্ণই অভ্যাসের ব্যাপার। যুগ যুগ ধরে তো এই শাড়ি পরেই আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জের মহিলারা কৃষিক্ষেত্রসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি কার্য সম্পাদন করে আসছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ শাড়ি পরেই ঘরের বাইরে বিভিন্ন কাজে ছোটোছুটি করে চলেছে। কেউ কেউ শাড়ি পরে, কাঁধে বাচ্চা ও হাতে ব্যাগ নিয়ে লাফিয়ে বাস ধরছে, কেউবা আবার মোটরসাইকেল চালাচ্ছে! ভারতের শান্তি নিকেতনেও শাড়ি পরে মহিলাদের সাইকেল চালাতে দেখা যায়।অনেকের মতে, শাড়ি তেমন শালীন পোশাক নয়। এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য আমি এমন কিছু মহিলাকে দেখেছি, যারা ব্লাউজের ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এনে শাড়িটিকেই খুব শালীনভাবে পরিধান করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলেছেন। আমি আমার পোশাক পরব নিজেকে সুন্দর এবং আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থাপন করার জন্য। কে কি বললো তাতে কিছু যায় আসে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্টাইল করে শাড়ি পরলে শরীরের কিছু অংশ দেখা যাবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু এই  জিনিসটাকে অনেকে  স্বাভাবিক ভাবে নেয় না, তারা এটাকে অশ্লীল মনে করে।

শাড়ি বাঙালির ঐতিহ্য। তাই এই ঐতিহ্য যাতে স্বার্থান্বে হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে মহিলাদের সচেতন করে তুলাই আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য। অন্যের ঐতিহ্যকে লালন করা নয় বরং নিজস্ব কৃষ্টি এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করে রাখতে পারাটাই গৌরবের কাজ। তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালি জাতির এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে মহিলাদের সচেতন হওয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here