ক্যাম্পাস থিয়েটার আন্দোলন: একটি রূপরেখা

0
203


আনন্দ বিনোদন ডেস্ক:

সংস্কৃতি মানুষের কায়িক ও মানসিক শ্রমের ফসল। একটি নির্দিষ্ট ভূ—খণ্ডে বংশপরম্পরায় বসবাসরত মানবসত্তার জীবন ও জীবিকা নির্বাহের শিল্পরূপ হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি একটি সমাজের বস্তুগত ও মানসিক সম্পদ। বাস্তবের কঠিন জমিনই সংস্কৃতির ভিত এবং বস্তুগত সম্পদের ভিত্তিতেই তার বেড়ে ওঠা। নৃত্য, সঙ্গীত, কাব্য, চলচ্চিত্র, নাটক, অভিনয়— এসব হচ্ছে মানব সমাজের নান্দনিক সংস্কৃতি। প্লেখানভ তাঁর ‘আর্ট অ্যান্ড সোশ্যাল লাইফ’ গ্রন্থে বলেছেন:
“শিল্পের মর্মবস্তু বাস্তবতার মধ্যে নিহিত। উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্ক মানুষের জীবনধারা নির্ধারণ করে, মানুষের জীবনের ভিত্তিতে গড়ে উঠে তার মনের জগৎ এবং মনের জগৎ নির্মাণ করে শিল্পের ভূবন।”

মানব সভ্যতার নান্দনিক সংস্কৃতির ধারায় ‘ক্যাম্পাস থিয়েটার’ এক নবতর সংযোজন। এ ধারার থিয়েটার বাংলার সংস্কৃতি জগত থেকে বিচ্ছিন্ন কোন সত্তা নয়। সংস্কৃতি জগতে ক্রম রূপান্তরের ধারায় ক্যাম্পাস থিয়েটারের আবির্ভাব এবং স্বমহিমায় এর আত্মঅধিষ্ঠান। বলা যায়, বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোক ঐতিহ্যের গর্ভ হতে ক্যাম্পাস থিয়েটারের আবির্ভাব ও ক্রমবিকাশ।

কিত্তনখোলার কিচ্ছা

বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে বিভিন্ন ধরণের লোকনাট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তার মধ্যে যাত্রাগান, কৃষ্ণলীলা, গম্ভীরা, ঢপকীর্তন, পাঁচালি বা পালাগান, যাত্রা, গীতাভিনয়, ঝুমুর, ধামালি, কথকতা, জারিগান, পালাটিয়া, লেটো, আলকাপ, চোরচোরনী, সঙের মিছিল, হাটে হাঁড়ি ভাঙা, কবির লড়াই, বোলবাই, ঢেঁকির মিছিল, শ্রীচৈতন্যের নগর—সংকীর্তন ইত্যাদি অন্যতম। বঙ্গ, রাঢ়, বরেন্দ্র ও সমতটে সুপ্রাচীনকাল থেকেই ‘লোকনাট্য’ অভিনীত হয়ে আসছে। লোকনাট্য অভিনয়ের যেমন একটি আসরিক দিক ছিল, তেমনি এটি পথে পথে, হাটে—গঞ্জেও অভিনীত হত। লোকনাট্যকে সেজন্য ‘পথনাটক’ও বলা হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে আমাদের দেশে পথনাটক ছিল। এটা পথে বের হত দেবতার পূজা উৎসবের শোভাযাত্রায়। তাই বাংলায় পথনাটকের উৎস ও ঐতিহ্য লোকায়ত। লোকধারার পথনাটক তৈরি হয়েছিল প্রয়োজনের নিরিখে। আজও যে তার কিছু কিছু বর্তমান রয়েছে তা ঐ প্রয়োজনের নিরিখ বলেই।

গ্রামীণ রূপকল্প থেকেই জন্মলাভ করেছে আমাদের লৌকিক নাট্যপদ্ধতিসমূহ। পরে এর শহরায়ন। আলকাপ, গম্ভীরা, হাটে হাড়ি ভাঙ্গা প্রভৃতি শিল্পকীর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। প্রায় একশো বছরের কিছু বেশি সময় আগে কলকাতা ও ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহল্লা থেকে সঙের মিছিল বের হত। সে সময়ে নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে পথনাটকের অভিনয় দেখার জন্য আগে থেকে দর্শক দাঁড়িয়ে থাকত। পথনাটকের অভিনেতারা ঘোড়াগাড়ি করে ঘুরে বেড়াতেন। তারা নির্দিষ্ট স্থানে অভিনয় করে আবার গাড়িতে উঠতেন। সঙরা ছড়া কেটে, গান গেয়ে এবং অভিনয় করে দুপাশের দর্শকদের আনন্দ দিতেন। এ প্রসঙ্গে এখানে প্রথম বাংলা রাজনৈতিক পথনাটকটির কথা উল্লেখ করা যায়। নাটকটির নাম ‘হোমরুল’; রচনা করেছিলেন মনোমোহন গোস্বামী। এই নাটকটি কলকাতার জেলেপাড়ার সঙের মিছিলে অভিনীত হয়েছিল। ঢাকার সঙের মিছিলে পথনাটক অভিনীত হত। ঢাকার পথনাটকে অভিনেতারা গরুর গাড়ির ওপরে এবং রাস্তায় রাস্তায় অভিনয় করতেন। এই পথনাটকগুলো একসময়ে বাঙালির জীবনধারাকে তুলে ধরেছিল।

পথনাটের একটি দৃশ্য

বাংলার বাইরেও পৃথিবীর অনেক দেশে এ রকমের পথনাটকের চর্চা হত। প্রসঙ্গত চিনের ‘ইয়াংকো’ এবং জাপানে ‘নো’ নাটকের কথা উল্লেখ করা যায়। চিনের নাটক ও নাট্যের অতীত ইতিহাসে দেখা যায় জনগণের প্রয়োজনেই গ্রামে নতুন ধারার নাট্যচর্চার প্রচলন ঘটেছিল। ইয়াংকোর উৎস লোকজীবন থেকে, সেই সূত্রে লোকজীবনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। উত্তর পশ্চিম চিনের ‘ইউ’ আকারের পিত নদীতে ঘেরা সিয়ান্সি প্রদেশেই এই ‘ইয়াংকো’র প্রথম জন্ম। গ্রামীণ মানুষের সুখের দিন অর্থাৎ বীজ বোনা ও ফসল তোলার সময় নাচ, গান ও অভিনয়ের যে আসর বসতো, তা থেকেই ইয়াংকোর পথচলা শুরু। ১৯৩৪—এ পিপলস আর্মির লোকেরা এই ইয়াংকোকে তাদের প্রচার মাধ্যম করে এগুতে চাইল। ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত শাসন—শোষণের বিরুদ্ধে পিপলস্ আর্মির লোকেরা জনগণকে সচেতন করার জন্য ইয়াংকোর অভিনয়ে পরিবর্তন আনেন। এই পরিবর্তন যেমন বিষয়ের দিক থেকে, তেমনি প্রয়োগের দিক থেকেও খানিকটা। পিপলস আর্মির লোকেরা পরিবর্তিত ইয়াংকোর প্রাণপ্রবাহ দলে দলে গ্রামে গ্রামে বইয়ে দিল। এমনকি ১৯৩৭—এ জাপানি আক্রমনের মোকাবেলায় শিল্পীর হাতিয়ার হিসাবে ইয়াংকো এক বিরাট ভূমিকা নেয়। শুধু পশ্চিমাঞ্চল নয়, সমগ্র চিনের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যম হয়ে উঠল ইয়াংকো নাটক।
‘ক্যাম্পাস থিয়েটার আন্দোলন’ হচ্ছে পথনাটকের আদলে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের নিকট উন্মুক্ত একটি সৃষ্টিশীল, শিক্ষামূলক ও জাতি—ধর্ম—বর্ণ নির্বিশেষে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি অরাজনৈতিক নাট্য আন্দোলন। এই থিয়েটারের উদ্দেশ্য— শিক্ষার্থীদের রুচিশীল ও যোগ্য নাট্যকর্মী হিসাবে গড়ে তোলা এবং ক্যাম্পাসে মানবিক সংস্কৃতির বিকাশ সাধন করা। ক্যাম্পাস থিয়েটার শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিকাশে অবদান রাখতে চায়। এতে করে তারা ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোকিত সদস্য হিসাবে জীবন গড়তে করতে পারবে।

সাধারণত একজন শিক্ষার্থী ছয় বৎসর বয়সে উপনীত হলে ক্যাম্পাস থিয়েটারে নাট্যকর্মী হিসাবে যোগদান করতে পারে। শিক্ষার্থী কেবল তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থিত ক্যাম্পাস থিয়েটারের সদস্য হতে পারবে। এই থিয়েটারে একজন নাট্যকর্মী পঁচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পায়। ক্যাম্পাস থিয়েটারে একজন নাট্যকর্মী তার অগ্রজকে গুরুতুল্য শ্রদ্ধা করে, অন্যদিকে একজন কনিষ্ঠ কর্মী সংগঠনে সহোদর ভ্রাতার মমতায় বেড়ে উঠবে। ক্যাম্পাস থিয়েটার সমষ্টির চিন্তা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়াসী। তাই এখানে কোন একজন নাট্যকর্মীর একক বটবৃক্ষ হওয়ার সুযোগ নেই।

কবর নাটকের একটি দৃশ্য

ক্যাম্পাস থিয়েটারে নাটকের ধরণটা কী রকম? এখন পর্যন্ত বিশ্বের সকল নাট্যকার নাটকে সামাজিক মানুষ এবং তার হাজারো বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তাই দেখতে হবে ক্যাম্পাস থিয়েটারের জন্য কী ধরণের নাটক রচনা করা যায়। এই নাটকের আঙ্গিক কেমন হবে, অথবা ক্যাম্পাস থিয়েটারের রাজনৈতিক, সংস্কৃতি ও দার্শনিক ভিত্তিটিই বা কি হওয়া উচিত। ক্যাম্পাস থিয়েটারের জন্য যারা নাটক রচনা করবেন তারা খেয়াল করবেন যে, এ ধরণের নাটক যেন কেবল বিষয়নির্ভর হয়ে না পড়ে অথবা শুধু রীতিসর্বস্বতার দিকে ঝঁুকে না যায়। ক্যাম্পাস থিয়েটারের নাটক রচয়িতা নাটক রচনার সময় এ দু’য়ের সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করবেন। কেননা এভাবে সমন্বয় ঘটাতে পারলে সৃষ্ট নাট্যকর্মগুলো সংশ্লিষ্টদের নিকট উপভোগ্য হয়ে উঠবে। নাটক রচয়িতা আরও চেষ্টা করবেন শিক্ষার্থীদের নিকট তাদের লেখা নাটকগুলো যেন বোধগম্য হয়। যে সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা বসবাস করে নাট্যকারকে সে সামাজিক বাস্তবতা মাথায় রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের আবেগ, অনুভূতি ও অভিপ্রায়কে নাটকে প্রতিফলিত করতে হবে। মোদ্দা কথা, আমাদের শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক প্রয়োজনের কথা নাট্যকারকে সবসময় ভাবতে হবে।

নাটক নিজে থেকে সমাজে কোন পরিবর্তন আনে না। এটি শুধু অণুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে। নাটক সমাজে পরিবর্তন আনার কথা তুলে ধরে। অভিনয় উপভোগের পর নাটকের বিষয়বস্তু দর্শকের চেতনায় সঞ্চারিত হয় এবং দর্শককে জাগিয়ে তোলে। গবেষক সাজেদুল আউয়ালের ভাষায়, ‘এটা যেন অনেকটা আলো দিয়ে আলো জ্বালানোর মতো ব্যাপার।’ ক্যাম্পাস থিয়েটারও তার উপলব্ধির আলো দিয়ে অন্যকে আলোকিত করবার জন্য নাটক তৈরি করবে এবং মঞ্চায়িত করবে। এ ধারার থিয়েটার মনে করে মানব সভ্যতার অগ্রগতির পথে সামন্ততন্ত্র, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সা¤্রাজ্যবাদ, সামরিকতন্ত্র, আমলাতন্ত্র, পুঁজিবাদী আগ্রাসন, সাংস্কৃতিক লেজুড়বৃত্তি ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। তাই ক্যাম্পাস থিয়েটার এই অন্ধকার দিকগুলো হতে বাংলার জনগণকে সজাগ রাখতে চায়। মানুষের মুক্তির জন্য আলোর দিশারী হতে চায়।
ক্যাম্পাস থিয়েটারের মূল উপজীব্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এরাই এর কর্মী ও দর্শক। শ্রেণিগত দিক থেকে এই শিক্ষার্থীরা পেটি বুর্জোয়া মনোভাবাপন্ন। তাই তাদের চেতনায় দোদুল্যমানতা বিরাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। বলাবাহুল্য যে, এই দোদুল্যমানতাকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে পারলে তারা জাতীয় সংস্কৃতিতে মহৎ অবদান রাখতে পারে। ক্যাম্পাস থিয়েটারের একটি আকাক্সক্ষা এই যে, এই মাধ্যমটি চর্চা করে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের নিজেদের মধ্যকার শিল্পসত্তাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কেননা ক্যাম্পাস থিয়েটার বাংলার সংস্কৃতিকে তার জনগণের সামনে তুলে ধরতে চায়।

ক্যাম্পাস থিয়েটারের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এটি এক ধরণের ‘আসরী অভিনয়ে’র মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এতে দর্শক এবং শ্রোতাবৃন্দও সমানভাবে অংশগ্রহণে সুযোগ পায়। দর্শক এখানে নিষ্ক্রিয় নয়, বরং যৌথভাবে অংশ নিতে পারে। ফলে যৌথ অংশগ্রহণ দর্শকগোষ্ঠীকে তার চেতনায় পরিবর্তন আনতে সহায়তা করে। ক্যাম্পাস থিয়েটারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবেশের মধ্যে উদ্ভুত অপরিমেয় দ্বন্দ্বকে মঞ্চের উপর নাটক—আকারে প্রত্যক্ষ করতে পারে, আবার দ্বন্দ্বসমূহের মীমাংসা কোন পথে সম্ভব সে—সম্পর্কেও আলোচনা এবং পরস্পর ভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করতে পারে।

ড. কামাল উদ্দিন শামীম
লেখক ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here