এস.এ.এম সুমন: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীত বিনোদন শিল্পের তিনটি প্রধান মাধ্যমই বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার আশা তৈরি হলেও বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট হয়নি। নতুন প্রযোজনা কমে যাওয়া, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত না আসা এবং দর্শক-সংকটের কারণে পুরো শোবিজ অঙ্গনে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা।
চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন সিনেমার ঘোষণা এখন হাতে গোনা। বড় বাজেটের অধিকাংশ সিনেমা এখনও দুই ঈদকে কেন্দ্র করেই মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে সর্বশেষ কোরবানির ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলোর প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক প্রযোজক।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের চলচ্চিত্র বাজারে সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার অভিনীত ‘প্রিন্স’ ও ‘রকস্টার’ প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। একইভাবে সিয়াম আহমেদ, আফরান নিশোসহ অন্যান্য জনপ্রিয় তারকাদের সিনেমা নিয়েও আলোচনা তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পুরো অর্থ ফেরত আসছে না। ফলে নতুন প্রযোজনায় অর্থ লগ্নি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন অনেক প্রযোজক।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাটক শিল্পেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে নির্মিত নাটকের বাজেট বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তুলনায় প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রযোজকরা। কোরবানির ঈদের পর বড় বাজেট ও বিশেষ আয়োজনের নাটক নির্মাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকুশলীদের কর্মব্যস্ততার ওপর। অনেক শিল্পী বর্তমানে বিদেশ সফরে রয়েছেন, কেউ কেউ আবার বিকল্প পেশা বা ব্যবসায় সময় দিচ্ছেন।
সংগীতাঙ্গনের পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। আগের মতো নিয়মিত স্টেজ শো বা কনসার্টের আয়োজন না হওয়ায় শিল্পীদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন গান প্রকাশের সংখ্যাও কমে এসেছে। এর ফলে গায়ক-গায়িকার পাশাপাশি গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালকদের কাজও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আপাতত নতুন গানের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। উৎসবকেন্দ্রিক প্রকাশনার বাইরে নতুন গান থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ায় তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী চলচ্চিত্র প্রযোজক বলেন, “আমরা বড় বাজেট, পরিচিত শিল্পী এবং মানসম্পন্ন নির্মাণ নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছি। কিন্তু মুক্তির পর অনেক ক্ষেত্রেই অর্ধেক বিনিয়োগও ফেরত আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সিনেমায় অর্থ লগ্নি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
এদিকে সংগীত প্রযোজকদের সংগঠন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সভাপতি এ কে এম আরিফুর রহমান বলেন, “আমরা নতুন গান তৈরির চেষ্টা করছি। কিন্তু উৎসবের বাইরে গান প্রকাশ করলে সেখান থেকে আয় প্রায় হয় না। এমনকি উৎসবের গান থেকেও অনেক সময় বিনিয়োগ উঠে আসে না। বিনিয়োগ ফেরত না এলে নতুন প্রযোজনায় অর্থ লগ্নি করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
বিনোদন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পটিকে আবারও গতিশীল করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্পন্ন কনটেন্ট নির্মাণ, আধুনিক বিপণন কৌশল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। অন্যথায় চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীত তিনটি মাধ্যমই আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :