এস.এ.এম সুমন : বিশ্বকাপ ফুটবল গৌরবের মঞ্চ। দেশের দূত হয়ে বিশ্বের কাছে জানিয়ে দেয় নিজেদের পরিচিতি। এই আনন্দমঞ্চে রোমাঞ্চকর কত কিছুই না ঘটে! গৌরবের পেছনে থাকে সংগ্রামের লড়াই। আয়োজন থেকে খেলার মাঠ—প্রতি পদক্ষেপে লুক্কায়িত হাজারো স্বপ্ন। যে তিন দেশ বিশ্বকাপের আয়োজক, তাদের আকাঙ্ক্ষা টুর্নামেন্ট সফল করা। যে ৪৮টি দেশ খেলবে, তাদের স্বপ্ন আবার অন্য। তারা চায় জয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত হতে। শিরোপা জয়ের স্বপ্ন তো রয়েছেই। ব্রাজিলের মিশন হেক্সা, আর্জেন্টিনার চাওয়া লিওনেল মেসি বিদায় নেবেন শিরোপা জিতে। ইউরোপের ফুটবল পরাশক্তিরা বিশ্বকাপে গেছে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব মহাদেশে বয়ে আনতে। হাজারো প্রত্যাশার মুখ হয়ে মেক্সিকোতে আজ পর্দা উঠছে বিশ্বকাপ ফুটবলের।
এই স্বপ্নযাত্রা বদলে দেয় বিশ্বের সূচি। দৈনন্দিন কাজের সময় এলোমেলো করে দেওয়ার উপলক্ষটা অবশেষে এসেই গেল। আর কিছু থাক বা না থাক, সামনের প্রায় দেড় মাসের ওই সূচিতে দুটি বিষয় নিশ্চিত থাকবে—হাতে রিমোট আর নির্ঘুম রাত। এর মূল কারণ বোধ হয় আলাদা করে বলার প্রয়োজন হবে না। কারণটা আপনারাও জানেন, চার বছর পর আবারও এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবল। যে উপলক্ষের জন্য মুখিয়ে থাকেন বিশ্বের সকল ফুটবলপ্রেমী! শুধু কি ফুটবলপ্রেমী? বিশ্বকাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও কম নেই। বিশ্বকাপের আমেজে ডুব দেওয়ার জন্য অত ফুটবল বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই!
তবে ঠিক চার বছর নয়, নির্দিষ্ট করে বললে, সময়টা সাড়ে তিন বছরের কিছু বেশি। বিশ্বকাপের চিরায়ত নিয়ম ভেঙে সর্বশেষ কাতার বিশ্বকাপ বসেছিল নভেম্বর-ডিসেম্বরে। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফিরছে জুন-জুলাইয়ের সেই চিরচেনা গণ্ডিতে। সময়ের নিয়মাবর্তিতায় ফিরলেও তার অবয়ব আর চরিত্র যেন নতুন রূপ নিয়েছে। শেষবার মরুর বুকের স্বাদ নিয়ে এবার বিশ্বকাপের জলসা বসছে মার্কিন মুলুকে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম তিন দেশের আয়োজনে কোনো টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে।
নতুনত্বের এখানেই শেষ নয়, অংশ নেওয়া দলের সংখ্যায়ও এসেছে পরিবর্তন। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ থেকে ৩২ দলের অংশগ্রহণ ছিল। এবার দলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৮টি। নতুন যোগ হয়েছে ১৬টি দল। বিশ্বকাপে এতে বেড়েছে ম্যাচের সংখ্যাও। আগে যেখানে ৬৪তম ম্যাচ শেষে চ্যাম্পিয়ন দল পেত বিশ্ব, এবার অপেক্ষায় থাকতে হবে ১০৪তম ম্যাচ পর্যন্ত।
এই ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১১টি ভেন্যুতে আয়োজন করবে ৭৮টি ম্যাচ; যার মধ্যে রয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহারণ। অন্য দুই আয়োজক মেক্সিকো ও কানাডাতে ম্যাচ হবে সমান ১৩টি করে। কানাডা দুই ভেন্যুতে বিশ্বকাপ আয়োজন সেরে নেবে, মেক্সিকো সেখানে প্রস্তুত রেখেছে তিনটি স্টেডিয়াম।
বলে রাখা ভালো, এর আগেও বিশ্বকাপ আয়োজন করার অভিজ্ঞতা আছে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের। সেদিক থেকে কানাডার জন্য অভিজ্ঞতাটা একেবারেই নতুন। ১৯৭০ ও ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল মেক্সিকো, আর ১৯৯৪-এর বিশ্বকাপ বসেছিল যুক্তরাষ্ট্রে।
মজার বিষয়, উত্তর আমেরিকায় হওয়া আগের তিন বিশ্বকাপের শিরোপা গেছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ঘরে। সেলেসাওরা দুবার, আলবিসেলেস্তেরা জিতেছে একবার। তিন দশকের বেশি সময় পর উত্তর আমেরিকায় ফেরা আরেকটি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নের সেই ধারা বজায় থাকবে কিনা তার উত্তর জানার অপেক্ষায় থাকতে হবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। বহুল প্রতীক্ষিত শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল গড়াবে নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়।
শেষটা নিয়ে যখন এত কথা হলো, শুরুটা নিয়ে না বললে চলে? মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে আজ দিবাগত রাত ১টায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে স্বাগতিক মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে বিশ্বকাপের। ম্যাচের দেড় ঘণ্টা আগে থাকছে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। শুধু মেক্সিকোতেই নয়, স্বাগতিক অন্য দুই দেশেও প্রথম ম্যাচের দেড় ঘণ্টা আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা।
ম্যাচের সময়ে ফেরা যাক। উদ্বোধনী ম্যাচ রাত ১টায়, ফাইনালও একই সময়ে। এটি ভেবে খুব বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার উপায় নেই। এবারের বিশ্বকাপে ১৩টি ভিন্ন সময়ে ম্যাচ শুরু হবে। রাত ১০টায় যেমন ম্যাচ আছে, ম্যাচ আছে সকাল ১০টাতেও। এক দিনে আছে সর্বোচ্চ ৪টি করে ম্যাচ। এবার বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই কেন হাতে রিমোট আর নির্ঘুম রাতের কথা বলা।
শুধু সমর্থকদেরই নয়, ধকল কম যাবে না ফুটবলারদেরও। বিশ্বকাপের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা ভোগাতে পারে, এ জন্য ‘কুলিং ব্রেক’ চালু করেছে ফিফা। প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধের মাঝে (২৩ মিনিট খেলা শেষে) থাকবে তিন মিনিট জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ। এমন আরও কিছু নতুন নিয়ম, তিন দেশের আয়োজন, ৪৮ দলের অংশগ্রহণ—এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ২০২৬ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’-এর বিশ্বকাপ বললেও বোধহয় ভুল হবে না। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত নিত্যদিনের খবর। গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এ সংঘাতে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ইরান বিশ্বকাপ খেলছে ঠিকই, কিন্তু দলটি প্রস্তুতি ক্যাম্প করতে বাধ্য হয়েছে মেক্সিকোতে। ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে, ম্যাচ খেলে আবারও মেক্সিকোতে ফিরতে হবে ইরানের ফুটবলারদের। দলটির ভিসা পাওয়া নিয়েও তো নাটক কম হয়নি।
ভূ-রাজনীতি, অভিবাসন নীতি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার বাইরেও টিকিটের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে শঙ্কার অনেক জায়গা আছে। তাই বলে উন্মাদনা তো আর থেমে নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহ যেমন চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে, তেমনি হতে যাচ্ছে রোমাঞ্চকরও।
আপনার মতামত লিখুন :