• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
anandabinodon.

মাইক্রোপ্লাস্টিক: নীরব বিষের থাবা, কীভাবে ঢুকছে শরীরে, বাঁচার উপায় কী?


FavIcon
আনন্দ বিনোদন
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 2, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগ্রহীত ad728

আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: সকালে দাঁত ব্রাশ, এক গ্লাস পানি পান, দুপুরে মাছ-ভাত কিংবা বিকেলে এক কাপ চা—দৈনন্দিন জীবনের এসব সাধারণ অভ্যাসের মধ্যেই অজান্তে শরীরে প্রবেশ করছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যার নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক। খালি চোখে দেখা না গেলেও বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এবং এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও এর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এই অদৃশ্য দূষককে ঘিরে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি দেশেও ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, টুথপেস্টই একমাত্র উৎস নয়। প্রতিদিনের খাবার, পানীয়, বাতাস, প্রসাধনী, সিনথেটিক পোশাক এবং বিভিন্ন প্লাস্টিকজাত পণ্যের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খালি চোখে দেখা যায় না।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত দুই ধরনের। একটি শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারে শিল্পকারখানায় তৈরি হয়, যা কিছু প্রসাধনী ও শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়। অন্যটি তৈরি হয় প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাদ্য মোড়ক, টায়ার এবং সিনথেটিক কাপড় দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর রোদ, তাপ, ঘর্ষণ ও পরিবেশগত প্রভাবে ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হওয়ার মাধ্যমে।

কীভাবে শরীরে প্রবেশ করছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রধানত তিনটি পথে শরীরে প্রবেশ করে—

  • খাবারের মাধ্যমে
  • পানির মাধ্যমে
  • শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে

সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, ঝিনুক, লবণ, বোতলজাত পানি, কলের পানি, চা-ব্যাগ এবং কিছু টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এছাড়া বাতাসে ভেসে থাকা সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাও শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।

কেন উদ্বেগ বাড়ছে?

একসময় মাইক্রোপ্লাস্টিককে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও শরীরে প্রবেশ করতে পারে, যা হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যহীনতা, প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা এবং হৃদ্‌রোগের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব?

বর্তমান বাস্তবতায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন হলেও সচেতনতা বাড়িয়ে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—

  • প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ও খাবারের পাত্র ব্যবহার করুন।
  • গরম খাবার কখনোই প্লাস্টিকের পাত্রে রাখবেন না বা গরম করবেন না।
  • একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমান।
  • নিরাপদ ও মানসম্মত পানি পান করুন।
  • ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
  • সিনথেটিক পোশাকের পরিবর্তে সুতি ও প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহার করুন।
  • টুথপেস্ট ও প্রসাধনী কেনার আগে উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকুন।

অদৃশ্য হলেও বাস্তব হুমকি

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারে কার্যকর নীতিমালা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পকারখানার ওপর কঠোর নজরদারি এবং নিরাপদ বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা, মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা না গেলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।